দৃঢ় প্রত্যায়ে নারী (বিবি রাসেল) তুমি জেগে উঠো আপন মহিমায়

ফ্যাশন আইকন বিবি রাসেল

জে হাছিবুর রহমানঃ যদি নারীর দিক থেকে দেখি, প্রতিদিনই আমাদের জন্য নারী দিবস –  বলেন বিবি রাসেল । নারী দিবসে নারীর সংগ্রাম ও অধিকার নিয়ে আমরা নানা আলোচনা করি, প্রত্যয় ব্যক্ত করি; এই আলোচনা ও প্রত্যয় আসলে প্রতিদিনই করা দরকার। কারণ নারীর সংগ্রাম প্রতিদিনই জারি থাকে, নারীর অধিকারের অন্বেষা প্রতিদিনই আমাদের সামনে এসে হাজির হয়। প্রতিদিনই নারীকে সংগ্রাম করতে হয় এবং পরের দিনের সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হতে হয়। তারপরও নারীর জন্য একটি বিশেষ দিবসকে উৎসর্গ করার গুরুত্ব ও তাৎপর্য তাতে করে খাটো হয়ে যায় না। এই দিবসটি আর কিছু না হোক, পুরুষদের একটি বড় অংশকে তার পরিবারের ও সমাজের নারীদের সংগ্রাম, সাহস ও অধিকারের কথা একদিনের জন্য হলেও মনে করিয়ে দেয়। খোদ নারীদেরও শপথ নবায়নে সহায়তা করে, প্রেরণা জোগায়। আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে আমি বাংলাদেশের ও বিশ্বের সব নারীকে শুভেচ্ছা, অভিবাদন ও অভিনন্দন জানাই।

আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ব্যক্তিত্ব জাতিসংঘ শুভেচ্ছা দূত বিবি রাসেল

প্রতি বছর নারী দিবসে একটি প্রতিপাদ্য থাকে। এবারও ব্যতিক্রম নয়। আমি মোটামুটি তিনটি প্রতিপাদ্য দেখতে পাচ্ছি। এর একটি জাতিসংঘ নির্ধারিত। ইউএন উইমেন নির্ধারিত প্রতিপাদ্যটি হচ্ছে_ ‘উইমেন ইন দ্য চেঞ্জিং ওয়ার্ল্ড অব ওয়ার্ক :প্লানেট ফিফটি-ফিফটি বাই টু থাউজেন্ড থার্টি’। অর্থাৎ তারা বলতে চাইছে, বিশ্বব্যাপী কর্মক্ষেত্রের যে পরিবর্তন চলছে, সেখানে নারীর অবস্থান নিয়ে। ২০৩০ সালের মধ্যে সেখানে নারীর ভূমিকা পুরুষের সমান হতে হবে। সেখান থেকেই ধারণা নিয়ে বাংলাদেশের মহিলা অধিদপ্তর জাতীয়ভাবে আরেকটি প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে। এতে বলা হয়েছে_ ‘নারী পুরুষ সমতায় উন্নয়নের যাত্রা/ বদলে যাবে বিশ্ব, কর্মে নতুন মাত্রা।’ আবার বিশ্বব্যাপী জাতিসংঘের বাইরে বিভিন্ন উন্নয়ন ও বাণিজ্যিক সংস্থার সমন্বয়ে আরেকটি জোট রয়েছে। এর নাম ‘ইন্টারন্যাশনাল উইমেন ডে’। তারা বলছে_ ‘বি বোল্ড ফর চেঞ্জ’। অর্থাৎ পরিবর্তনের জন্য নারীদের সাহসী হতে বলছে।

আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ব্যক্তিত্ব ,জাতিসংঘ শুভেচ্ছা দূত, বিবি রাসেল

লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্যের তিনটি ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য থাকলেও প্রেক্ষিত একই। পরস্পর সম্পর্কিত। তিনটি ক্ষেত্রেই তিনটি শব্দ রয়েছে_ একটি হচ্ছে পরিবর্তন, নারীর ভূমিকা ও কর্মক্ষেত্র। বাংলাদেশের দিক থেকে দেখলে দেখা যাবে, আমাদের নারীর জন্য এর কোনোটিই নতুন নয়। এখানে নারীকে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হয়, এগিয়ে যেতে হয় সংগ্রাম করেই। নিজেকে দিয়ে বুঝি, আমাদের দেশে নারীর কর্ম ও বিচরণ ক্ষেত্র কতটা কণ্টকাকীর্ণ। আমি ইউরোপে শিক্ষা গ্রহণ করেছিলাম, প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলাম, আন্তর্জাতিকভাবে কিছুটা হলেও পরিচিতি তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে আমি এসেছি এমন একটি পরিবার থেকে, যেখানে আমার মা ও বাবা উভয়েই স্বনামে পরিচিত। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলন, স্বাধিকার ও স্বাধীনতা সংগ্রামে তারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। তাদের মেয়ে হয়েও, নিজের যোগ্যতা ও পরিচিতি সত্ত্বেও আমাকে যে ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দিতে হয় প্রতিনিয়ত, সেখান থেকে বুঝি একজন সাধারণ নারীর জীবন ও সংগ্রাম কতটা ঊর্মিমুখর।

আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ব্যক্তিত্ব ,জাতিসংঘ শুভেচ্ছা দূত, বিবি রাসেল

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলে গেছেন_ ‘বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর,/ অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’ কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় এর স্বীকৃতি এখনও অনেকখানি অধরা। বিশেষ করে নারীর আর্থিক ক্ষমতায়ন এবং তার মজুরির আর্থিক স্বীকৃতি এখনও বহুলাংশে অধরা থেকে গেছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নারীর মজুরিবিহীন ও স্বীকৃতিহীন কাজ বা অবদানের আর্থিক মূল্য নিরূপণ এবং জিডিপির মানদণ্ডে তার তুলনা করার লক্ষ্যে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ও সিপিডি যৌথভাবে ২০১৪ সালে একটি গবেষণা করেছিল। এতে দেখা গেছে, ১৫ বছর বা তার চেয়ে বেশি বয়সের একজন নারী সমবয়সী একজন পুরুষের তুলনায় প্রায় তিন গুণ সময়ে এমন সব কাজে নিয়োজিত থাকে, যা জিডিপিতে অন্তর্ভুক্ত হয় না। আমি মনে করি, নারীর কাজের আর্থিক মূল্য চিহ্নিত হওয়া বা না হওয়ার সঙ্গে নারীর মর্যাদা ও ক্ষমতায়নের বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শুধু অর্থনৈতিক মূল্য স্বীকৃত নয় বলেও নারীর কাজ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সমাজ ও পরিবারের কাছে ‘মর্যাদাহীন’ গণ্য হয়। একটি সমৃদ্ধ ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গড়ে তুলতে হলে এই অস্বীকৃতির অবসান ঘটাতেই হবে।

কৃষিক্ষেত্রে বাংলাদেশ ঈর্ষণীয় উন্নতি করে চলছে। কিন্তু কৃষিক্ষেত্রেও সাদা চোখে দেখলে মনে হয়, যেন পুরুষই কেবল কাজ করেন। অথচ বিভিন্ন গবেষণায় এটা প্রমাণিত যে, বীজ সংরক্ষণ থেকে ধান গোলায় তোলা পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে নারী কৃষকের অবদান ও তৎপরতা পুরুষ কৃষকের তুলনায় বেশি। কিন্তু নারী ‘কৃষক’ মর্যাদা কমই পান।

আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ব্যক্তিত্ব ,জাতিসংঘ শুভেচ্ছা দূত, বিবি রাসেল

আমি বাংলাদেশে থাকলে যখনই সুযোগ পাই গ্রামে চলে যাই। গ্রামীণ নারীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করি, কথা বলি। তাঁতি নারীদের সঙ্গে তাদের কাজের কথার পাশাপাশি নিজের পরিবারের কথা জানতে চাই। তার চাওয়া, পাওয়া, ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, সংসারের পরিস্থিতি, পিতা, স্বামী বা পুত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের মাত্রা বুঝতে চাই। তারা আমাকে কাছে পেয়ে সব খুলে বলে। মনের দুয়ার খুলে দেয়। দেখতে পাই, তাদের জীবন এখনও কতটা কঠিন। তাঁতি বা কৃষকের জীবনে যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তার বাইরেও নারী কৃষক বা তাঁতির জীবনে রয়েছে আরও অনেক সংগ্রাম। তাদের সংগ্রাম দ্বিগুণ। আমি দেখেছি, পুরুষের তুলনায় নারীরা কাজে বেশি আন্তরিক, এমনকি দক্ষ। কিন্তু তারা সেই আন্তরিকতা ও দক্ষতার মূল্য পায় না। আমি যদিও আমার কাজের ক্ষেত্রে সবসময় নারীকে অগ্রাধিকার দেই এবং তারা যাতে কোনোভাবেই পুরুষদের তুলনায় বঞ্চিত না হয়, সেদিক কড়া দৃষ্টি রাখি।

মডেলও ডিজাইনার – বিবি রাসেল

বাংলাদেশে নারীদের পরিস্থিতির অপর পিঠের কথাও বলতে হবে। আমি যদি বলি যে বাংলাদেশ এখন চালাচ্ছেন চারজন নারী, ভুল হবে না। টানা কয়েক মেয়াদ থেকে আমরা একজন নারী প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা পেয়ে এসেছি। বর্তমান সংসদে বিরোধী দলের নেতা এবং সংসদের বাইরে থাকা প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতাও নারী। আবার স্পিকার হিসেবেও আমরা পেয়েছি একজন নারীকে। সংসদে, মন্ত্রিসভায়, প্রশাসনেও নারীর অংশগ্রহণ তৃতীয় বিশ্বের বাস্তবতায় যথেষ্ট উৎসাহব্যঞ্জক। স্থানীয় সরকারগুলোতে সংরক্ষিত কোটায় বিপুল নারী অংশগ্রহণ করেন। এর বাইরেও নারীরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন এবং নির্বাচিতও হন। আমরা এবারই প্রথম একজন নারী নির্বাচন কমিশনার পেয়েছি।

মডেল ও ডিজাইনার – বিবি রাসেল

নারী দিবস উপলক্ষে আমি বলতে চাই, রাষ্ট্রীয় বা আনুষ্ঠানিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর এই গৌরবোজ্জ্বল অবস্থানকে একেবারে প্রান্তের নারীটির কাছেও নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, আমাদের দেশের বড় অংশ এখনও গ্রামীণ জনপদ। নারী দিবসের তাৎপর্য, শপথ বা নারী অধিকারের নজরদারি শহরাঞ্চলে যেমন, গ্রামে ততটা পেঁৗছে না। নারীদের কর্মক্ষেত্রের বড় অংশ এখনও গ্রামনির্ভর। সেখানকার কৃষি, বস্ত্র ও হস্তশিল্পে। সেসব নারীর কাছে যেতে হবে, তাদের জানতে হবে, জানাতে হবে, জাগাতে হবে।

ডিজাইনার ও বিডি ফ্যাশন আইকন – বিবি রাসেল

গ্রামাঞ্চলের সাধারণ নারীদের মধ্যেও যেসব নারী আরও অবহেলিত, বিপর্যয়ের শিকার তাদের জন্য নারী দিবসের বাণী আরও জরুরি। এই লেখা যেদিন লিখছি, সেদিনই, মঙ্গলবার এসিডদগ্ধ নারীদের নিয়ে আমি একটি ফ্যাশন শো করেছিলাম রাজধানীতে। তাদের সময় দেওয়ার জন্য, রিহার্সেলের জন্য আমি ২৭ ঘণ্টা উড়ে এসে নারী দিবসের আগে ঢাকায় হাজির হয়েছি। এর পুরস্কারও পেয়েছি। সেই পুরস্কার তাদের চোখের ভাষা, তাদের হাসি। তাদের সাহসিকতা। এসিড সন্ত্রাসের মতো ভয়াবহ শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক অভিঘাতের পরও তারা যেভাবে আত্মবিশ্বাস দেখিয়েছে, তা আমাদের জন্য শিক্ষণীয়। কয়েক দিন একসঙ্গে কাজ করে আমি তাদের ভেতরের সৌন্দর্যের সন্ধান পেয়ে গেছি। তাদের ভেতরের আলো দেখে ফেলেছি। এই আলো আমাদের সবাইকে আলোকিত করতে পারে।

নারী দিবসে আমি বাংলাদেশের সব নারীর ভেতরের সেই আলো সবাইকে দেখতে বলি। দেখতে বলি, নারী কীভাবে আমাদের সমাজ ও সংসার আলোকিত করতে পারে।

ডিজাইনার ও বিডি ফ্যাশন আইকন – বিবি রাসেল ও সাংবাদি (Fashion for development) জন্য কাজ করে চলেছেন ও বিবি রাসেলই একমাত্র ফ্যাশন আদর্শ  -সাংবাদিক জে হাাাছিবুর রহমান 

আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ব্যক্তিত্ব
জাতিসংঘ শুভেচ্ছা দূত
বিবি রাসেল

You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.