করোনাভাইরাস ও বাংলাদেশের তৈরী পোশাকশিল্প

সালাউদ্দিন আলমগীর, সিআইপি
প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ ডাইড ইয়ার্ণ এক্সপোর্টার্স এ্যাসোসিয়েশন ডিরেক্টর, এফবিসিসিআই
চেয়ারম্যান, লাবিব গ্রুপ।

বর্তমান বিশ্বে নভেল করোনাভাইরাস এক বড় আতঙ্কের নাম। এর ভয়ে কাঁপছে আজ গোটা বিশ্ব। প্রথম দিকে এর আবির্ভাব চীন দেশে হলেও দিনে দিনে এই মরণব্যাধি ছড়িয়ে পড়ছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। ইতোমধ্যেই এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা, অষ্ট্রেলিয়া ও আফ্রিকার প্রায় ৬০টি দেশে এর প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। বর্তমানে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় ৮৮০০০ যাদের মধ্যে মৃতের সংখ্যা আনুমানিক ৩০০০ এবং প্রতিদিন এর সংক্রমণ ও আক্রান্তের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
মানবিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে বিশ^ব্যাপী ছড়িয়ে পড়া এই ভাইরাস বড় ধরণের আঘাত হানছে অর্থনীতিতেও। ফলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পৃথিবীব্যাপী জরুরী অবস্থা জারি করেছে। অর্থনীতি বিশ্লেষকরা আশংকা করছেন, করোনাভাইরাসের মহামারি ২০০৮ সালে শুরু হওয়া বিশ^মন্দাকেও হার মানাতে পারে। ইতিমধ্যে বিশ^ব্যাপী শেয়াবাজারের ব্যাপক দরপতন হয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কেবল গত সপ্তাহেই বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। কমে গেছে জ¦ালানী তেলের দাম (৪৬.১৯ইউএসডি/ব্যারেল) যা গত ৪ বছরের মধ্যে সর্বনি¤œ। করোনাভাইরাসের প্রভাব ধীরে ধীরে হ্রাস পাবে বলে ধারণা করা হলেও বাস্তবে ঘটছে এর উল্টোটা। বিশ্ব ব্যাপী মহামারির রূপ নিয়েছে অপ্রতিরোধ্য এই ভাইরাস। ফলে এর ভয়াবহ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে সারা বিশ্ব যার প্রভাবে গভীর উদ্বেগ তৈরী হয়েছে বিশ্ব  বাজার ও অর্থনীতিতে।
উদ্বেগ বাড়ছে বাংলাদেশেও। চীন থেকে পণ্য আমদানি ব্যাহত হওয়ায় এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে আমাদের দেশে। বিশেষ করে তৈরী পোশাকশিল্পে এর প্রভাব পড়ছে খুব বেশি। প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, ফিনিশ্ড গুড্স ও এক্সেসরীজের সংকটজনিত কারণে ইতিমধ্যেই তাদের দাম অনেকটা বৃদ্ধি পেয়েছে।
দেশে উদ্যোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে। এককভাবে চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৪৭৯ কোটি মার্কিন ডলার। বর্তমানে চীন থেকে পণ্য আমদানি ব্যাহত হওয়ায় সমূহ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন উদ্যোক্তারা। দেশের বিভিন্ন ব্যবসা ও বাণিজ্য সংগঠন তাদের আসন্ন ক্ষয়ক্ষতির তীব্র আশংকা প্রকাশ করছেন।
নিঃসন্দেহে করোনাভাইরাস বর্তমান বিশ্ব এক জরুরী সমস্যা যদিও বাংলাদেশের ডাইং সেক্টরে এর প্রভাব কিছুটা কম, কারণ ডাইং ফ্যাক্টরীগুলোর কাঁচামাল আমদানি একটি চলমান প্রক্রিয়া, তাই তারা চায়না হলিডে’র বিষয়টি মাথায় রেখে তাদের চাহিদা অনুযায়ী কিছু কাঁচামাল ও অন্যান্য পণ্যসামগ্রী চায়না হলিডে’র পূর্বেই আমদানি করতে সমর্থ হয়েছে এবং কিছু মালামাল প্রস্তুত রয়েছে যা তাদের ফ্যাক্টরী খোলার সঙ্গে সঙ্গেই জাহাজীকরণ সম্ভব হবে। তাছাড়া করোনাভাইরসের সংক্রমণ ও এর আপদকালীন সংকটের বিকল্প হিসেবে তারা তাদের কাঁচামাল আমদানির বিকল্প উৎস্যও খুঁজে পাবে এবং ইতিমধ্যেই সকল কাঁচামাল আমদানির বিকল্প উৎস হিসেবে ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ইন্ডিয়া ও নেপালকে বিবেচনায় নিয়েছে। ফলে ডাইড ইয়ার্ণের মূল্য পাউন্ড প্রতি ১০ থেকে ১৫ টাকা বাড়লেও মূল প্রভাবটা পড়বে তৈরী পোশাকশিল্পে।
সত্যিই যদি ইউরোপ ও আমেরিকায় করোনাভাইরসের মহামারি ব্যাপক আকারে শুরু হয় এবং খুব তাড়াতাড়ি যদি এর প্রতিরোধ সম্ভব না হয়, আর সে কারণে যদি ইতালির মত অন্যরাও তাদের রিটেইল শপগুলো ধীরে ধীরে বন্ধ করে দেন, তবে বাংলাদেশে ব্যাপকহারে তাদের কাজের অর্ডার কমে যাবে এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের তৈরী পোশাকশিল্প মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হবে।”
বাংলাদেশ চীন থেকে বছরে গার্মেন্টসের কাঁচামাল আমদানি করে ৫০২ কোটি মার্কিন ডলারের; যার মধ্যে টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস এক্সেসোরিজের সরবরাহ থাকে ৪০ শতাংশ। কিন্তু বর্তমানে তাদের এই সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বেশ কিছু কাঁচামাল ও এক্সেসোরিজের দাম ইতোমধ্যেই বেড়ে গেছে। ফলে অনেক উদ্যোক্তা তাদের এলসিকৃত পণ্য উৎপাদনে হিমসিম খাচ্ছেন এবং যথাসময়ে তারা তাদের উৎপাদিত পণ্য ডেলিভারী দিতেও ব্যর্থ হচ্ছেন। যাহোক, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে চীনের পণ্য সরবরাহ প্রক্রিয়া স্বাভাবিক না হলে বাংলাদেশসহ সারা বিশে^র ব্যবসায়ীগণ বিপুল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবেন।

হাছিবুর রহমান/ বাংলাদেশ টাইমস  

Leave A Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.